বাল্যবিবাহ পাকিস্তানী সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ
এ বছর প্রকাশিত ইউনিসেফের একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে প্রতিবছর সারাবিশ্বে প্রায় এক কোটি মেয়ের ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যায়।
বর্তমানে ইংল্যান্ড সরকার কাউকে জোর করে বিয়ে দেওয়াটা অপরাধ হিসাবে গণ্য করার কথা ভাবছে যাতে অভিবাসী বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়দের ভেতরে এই চর্চা বন্ধ করা যায়।
পাকিস্তানে ১৬ বছরের নিচে কোন মেয়েকে বিয়ে দেওয়া এখনই অবৈধ।
কিন্তু সিন্ধু থেকে নাঈম সাহউতারার প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে এই ঐতিহ্য বন্ধ করাটা বেশ কঠিন।
এই বাচ্চা মেয়েটার নাম কান্বাল যার মানে জলপদ্ম।
কিন্তু তার ভাগ্য তার নামের মতো অতো সুন্দর নয়।
“আমার মেয়ের বয়স মাত্র ৯ বছর আর বরের তিরিশেরও বেশি। আমাদের ঐতিহ্য হচ্ছে ছেলেমেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়া। আমি বড় বড় শহরে অনেক মেয়েকে দেখেছি বেশ বয়স হওয়ার পরেও নানা কারণে বিয়ে করেনা। কাজেই আমার মনে হয় জীবিতাবস্থায় আমার মেয়ের বিয়ে দেখে যেতে পারাটা ভাগ্যের ব্যাপার।”
আমিরের পূর্বপুরুষেরা এই খরাপীড়িত মরুভূমি কাটছতে বাস করে আসছেন যেখানে দিনে দু’বার খাবার জোটানোই মানুষের জন্যে অনেক কষ্টের কাজ।
অনেকের জন্যেই টাকার বিনিময়ে বাচ্চা মেয়েদের বিয়ে দেওয়াটা বিয়ের খরচের বোঝা হালকা করার একটা উপায়।
কখনো কখনো এটা অন্যভাবেও লাভজনক...
আমিরের নিজেরও বাচ্চা বয়সে বিয়ে হয়েছিলো এবং তার মেয়ের বিয়ের জন্যেও টাকা পেয়েছেন।
“বরের পরিবার আমার মেয়েকে বিয়ে করার জন্যে আমাকে ৯০০ মার্কিন ডলার দিয়েছে। গত বছরের বন্যা আমাদের এলাকাছাড়া করেছে এবং আমাদের কোন ঘরও নেই। কাজেই আমার আর কোন উপায় ছিলনা। আমার দুটো অন্ধ ছেলে আছে এবং আমি খুব গরীব। কাজেই যখন আমার আত্মীয়েরা এই টাকার প্রস্তাব করলো আমি বিয়েতে সম্মতি দিলাম। আমাদের থাকার জন্যে একটা ঘর দরকার।”
কিন্তু তার মেয়ের বিয়ে অবৈধ।
খুব বিরল ঘটনা হিসাবে পাকিস্তানের পুলিশ এ বিয়েটা বানচাল করে দেয়। তারা বর ও কনের বাবাকেও গ্রেফতার করে।
আত্তা মাহমুদ লাশারি স্থানীয় কাজী যিনি বিয়েটা পড়ান। তাকেও গ্রেফতার করা হয়েছিলো কিন্তু এমন আর করবেন না এমন শর্তে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
“ইসলামে বাল্যবিবাহ পুরো নিষিদ্ধ কিন্তু মানুষ এটা সম্পর্কে ভালো জানে না। মানুষ অনেকসময় আমার কাছে এসে মিথ্যা বলে যে তাদের ছেলেমেয়ে বিয়ের উপযুক্ত কিন্তু আসলে তারা তা না। আবার কাজী যদি জানেও তবু কিছু বলতে পারেনা কারণ সমাজ ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা তার উপর ক্ষেপে যাবে।”
পাকিস্তানের অনেক গ্রাম্য এলাকাতেই মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়াটা একটি সুপ্রাচীন ঐতিহ্য।
২০০৯ সালের ইউনিসেফের একটি প্রতিবেদন অনুসারে পাকিস্তানের শতকরা ২৫ ভাগ বিয়েই বাল্যবিবাহ।
৪০ হাজার মানুষের ওয়াহি পান্ধি গ্রামের প্রায় সবারই বাল্যবিবাহ হয়েছে।
৫০ বছরের আবদুল মাজিদের মতো বয়স্করা এ ঐতিহ্য অন্ধভাবে বিশ্বাস করেন।
মেয়ে নারী হয় ১২ বছর বয়সে আর ছেলেরা পুরুষ হয় ১৭ থেকে ১৮ বছর বয়সে। একটা মেয়ের মাসিক শুরু হলেই বাবামা’র উচিত যতো দ্রুত সম্ভব তার বিয়ে দিয়ে দেওয়া। না’হলে প্রতিবার মাসিকের সময় তার ডিম্বাণু নষ্ট হওয়ার পাপ তার বাবামা’এর উপর পড়বে। আমাদের ধর্ম তাই বলে। আমারও অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিলো। আমার বিয়ের দুই বছর পর আমার মনে হতে থাকে যে আমি প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছি।”
তার আট মেয়েরই বাল্যবিবাহ হয়েছে।
“মেয়েদের প্রেম করতে দিলে কেউ তার কুমারিত্ব নিয়ে খেলা করবে। শ্রদ্ধেয় পিতামাতা এটা মানতে পারেন না। কাজেই কুমারিত্ব বজায় রাখতে আমরা এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে চাই। এটা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসছে। আজ একদিনে এটা আমরা বদলাতে যাবো কেন?”
কিন্তু ১৯৯০ সাল থেকে পাকিস্তানে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ। কোন মেয়ের বিয়ে হতে গেলে অবশ্যই ১৬ বছর হতে হবে।
কিন্তু পাঁচ বছরের মেয়েরও বিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় একটি ম্যাগাজিনের সম্পাদক কাদির লাশারি বলেন দারিদ্র্য ও অশিক্ষাই এর মূল কারণ।
২০০৪ সালে সিন্ধু উচ্চ আদালত বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করে এবং এ বছর শুরুর দিকে শিশুদের রক্ষায় একটি নতুন বিল আনা হয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নারগিস এন. ডি. খান বলেন সরকার এ প্রথা বন্ধে বদ্ধপরিকর।
”শিশুদের রক্ষায় যা করা দরকার আমরা করেছি। আমি শিশু রক্ষা অধিকার বিল এনেছি যা সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়েছে। কাজেই এটা এখন আইন এবং এটা দিয়ে আমরা আইন ও নীতি ভঙ্গকারীদের শাস্তি দিতে পারবো।”
কিন্তু ঠিক কিসের ভিত্তিতে শাস্তি দেওয়া হবে সে বিষয়ে মন্ত্রী কিছু জানাতে পারেননি।
শিশু অধিকার কর্মী গুলাম মাদনি মেমন বলেন এখন পর্যন্ত শাস্তি খুবই কম।
”শাস্তি মাত্র দুই মাসের কারাভোগ ও ১০০ রুপী মানে ১ মার্কিন ডলার জরিমানা। এই শাস্তি অবশ্যই এক লাখ রুপী বা ১০০০ মার্কিন ডলার ও দুই বছরের কারাভোগ পর্যন্ত বাড়ানো উচিত।”
আমির জাদি, যার ৯ বছরের মেয়ের বিয়ে পুলিশ ভেস্তে দিয়েছে, এখন অন্য ধরণের শাস্তি ভোগ করছেন।
গত সপ্তাহে স্থানীয় উপজাতীয় সালিশে স্থানীয় ঐতিহ্য ভঙ্গের দায়ে তার পরিবারকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বলা হয়েছে।
“আমি জানিনা কি করবো। বরের পরিবার তাদের টাকা ফেরত চাচ্ছে কিন্তু সেটা দিয়ে ইতোমধ্যেই আমি আমাদের বাড়ির জন্যে এক টুকরো জমি কিনে ফেলেছি। এবং আইনের কারণে টাকা জোগাড় করতে আমি আমার মেয়ের অন্য কোথাও বিয়েও দিতে পারিনা কারণ তার বয়স কম। আমার জন্যে এটা উভয়সংকট।”

0টি মন্তব্য:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]
<< হোম